Friday || June 25, 2021 Online Tech News Portal
img

করোনায় মৃত, সুস্থ ও আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন

Posted on : 2020-05-06 11:46:58

News Source : ইত্তেফাক, ০৫:৫০, ০৬ মে, ২০২০

করোনায় মৃত, সুস্থ ও আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন

দেশে করোনা ভাইরাসে মৃত, আক্রান্ত ও সুস্থ হওয়ার সংখ্যা প্রশ্নাতীত নয়। জনমনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। প্রতিদিনই সারাদেশে করোনা উপসর্গ নিয়ে এবং হাসপাতালে করোনা ইউনিটে ৫ থেকে ১০ জন রোগী মারা যাচ্ছে, যা সরকারি হিসেবের বাইরে থেকে যাচ্ছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে করোনা ইউনিট চালু হওয়ার পর গত চার দিনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩০ জন রোগী মারা গেছেন। এদের মধ্যে মাত্র চার জনকে পরীক্ষায় করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, এত লাশ রাখা সম্ভব নয়। তাই করোনা পরীক্ষা ছাড়াই লাশগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে মরদেহ দাফনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দৈনিক ইত্তেফাকের সংবাদদাতাদের প্রেরিত তথ্যানুযায়ী গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ২৩৯ জন ।

সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এমন অনেক উদাহরণ আছে উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাকরা বলছেন, করোনায় মৃত, আক্রান্ত ও সুস্থ হওয়ার সংখ্যা নিয়ে সরকারি যে আনুষ্ঠানিক ভাষ্য আসছে তা প্রশ্নের বাইরে নয়। করোনার উপসর্গ নিয়ে যারা মারা যাচ্ছে তাদেরও তালিকা প্রকাশ করা উচিত। আমেরিকা, ইউরোপসহ সারাবিশ্ব করোনা মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে এবং তারা তা স্বীকারও করেছে। তাই করোনার মতো বিপজ্জনক ভাইরাসের শিকার হওয়াদের সংখ্যা নিয়ে লুকোচুরি করলে বরং ক্ষতির মাত্রা বাড়বে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, দিন যতই যাচ্ছে ততই করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা তীব্র হচ্ছে। এখন পর্যন্ত এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আনতে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রতিষেধক তৈরি করতে পারেনি। প্রতিষেধক বা পরিত্রাণের পথ হিসেবে বলা হচ্ছে— নিয়মিত হাত ধোয়া, স্যানিটাইজার ব্যবহার করা, আইসোলেশনে থাকা, ঘরের বাইরে না যাওয়া, জনসমাগম এড়িয়ে চলা। আর এ কারণেই পৃথিবীর প্রায় সবদেশেই চলছে ঘোষিত বা অঘোষিত লকডাউন। যেখানে বলা হয়েছে একেবাইরেই ঘরের ভেতরে থাকতে, বাইরের কারো সঙ্গে মেলামেশা না করতে। কারণ করোনা ভাইরাস মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ। দ্রুতই এই রোগ এক জন থেকে আরেক জনে ছড়িয়ে পড়ে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসেব অনুযায়ী আমাদের দেশে করোনায় এ পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ৯২৯ জন। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরো এক জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৮৩ জন হয়েছে। কিন্তু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যে ৩০ জন মারা গেছেন তারা কিন্তু এই হিসেবের বাইরেই রয়েছেন। এতদিন ৮/১০ জন করোনা রোগী প্রতিদিন সুস্থ হয়ে উঠছেন বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু সোমবার হঠাৎ করে বল হলো ১৪৭ জন সুস্থ হয়েছেন। আর গতকাল মঙ্গলবারের ব্রিফিংয়ে বলা হয়, বিভিন্ন হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় সেরে উঠেছেন আরো ১৯৩ জন। হঠাৎ করে সুস্থ হওয়ার হার কীভাবে বাড়ল—এটা নিয়েও জনমনে সৃষ্টি হয়েছে কৌতূহল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, দেশে করোনার কমিউনিটি সংক্রমণ বাড়ছে। যেহেতু চাহিদার তুলনায় পরীক্ষার ব্যবস্থা সীমিত, আবার করোনার ফলস নেগেটিভ রিপোর্টও আসছে, তাই যারা করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছে তাদের করোনা হিসেবেই ধরা উচিৎ। এটা লুকানো উচিৎ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিদিন বিএসএমএমইউয়ে ৩০০ থেকে সোয়া ৩০০ রোগীর করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু রোগী আসছে কয়েক হাজার।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান বলেন, করোনা নিয়ে অস্বচ্ছতা ও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। সারাবিশ্ব করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় ওলটপালট হয়ে গেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। চিকিৎসকরা দিনরাত সেবা দিচ্ছেন। করোনা নিয়ে লুকোচুরির কিছু নেই। চীনের যেসব এলাকায় সংক্রমণের হার বেশি সেখানে লকডাউন দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশেও তাই হওয়া উচিত। দেশের সব জায়গায় লকডাউন তুলে দেওয়া উচিত হয়নি। তিনি বলেন, যেসব রোগী করোনার উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের তালিকা প্রকাশ করতে অসুবিধা কোথায়?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রো-ভিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপন ডা. রুহুল আমিন বলেন, কোনো রোগী যখন ক্লিনিক্যালি করোনা শনাক্ত হয়ে যায়, তখন তাকে করোনা রোগী বলতে অসুবিধা নেই। এসব ক্ষেত্রে লুকানো এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সীমিত পরিসরে হওয়ায় সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় হযবরল অবস্থা বিরাজ করছে। তিনি বলেন, ভারতের মতোই নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীসহ করোনায় আক্রান্ত বেশি মানুষের এলাকায় লকডাউন বহাল রাখা উচিত। নইলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল সাব কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. খান মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ঢামেকে যতগুলো করোনা রোগী এসেছে, সবাই বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে শেষ পর্যায়ে এসেছে। এ কারণে অনেককে চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়নি।

অপরদিকে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মজিবুর রহমান বলেন, পরীক্ষায় শনাক্ত না হওয়ার আগে বলা যায় না যে, করোনায় মারা গেছেন। তিনি বলেন, চাহিদা অনুযায়ী আইসিইউ বেড একেবারেই সীমিত। মাত্র ১০টি আইসিইউ বেড রয়েছে। অভিজ্ঞ জনবলেরও খুবই সংকট।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, পরীক্ষায় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা কাউকে করোনায় মৃত বলতে পারি না। করোনা উপসর্গে মৃতদের এ কারণে নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। গত ১৮ মার্চ কোভিড-১৯ এ প্রথম মৃত্যুর কথা জানায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট। প্রতিদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত আপডেট দিয়ে যাচ্ছে। তবে শুরু থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এরকম অভিযোগ করছেন যে সরকারের পক্ষ থেকে করোনায় আক্রান্ত ও মৃতদের সঠিক তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। অনেকেই এই অভিযোগের পক্ষে ও বিপক্ষে বহুবিধ যুক্তি তর্ক প্রদর্শন করছেন। দেশে করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা পর্যাপ্ত নেই। আবার আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, বেসরকারি সব হাসপাতালে পরীক্ষার অনুমোদন দিলে এই প্রাণঘাতী ভাইরাস নিয়ে শুরু হয়ে যাবে অনৈতিক বাণিজ্য।

জাতীয়